আক্ষেপ আরো একটি দিনের ,আরেকটু জীবনের

Please log in or register to like posts.
পোস্ট
কলিম উদ্দিন পকেটে প্রাণ নিয়ে ছুটছেন। জঙ্গল বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে তার পেছনে ফেউ লেগেছে। কলিম উদ্দিন ঘামে ভেজা মুখটা হাতের তেলোয় মুছে নিয়ে দ্রুত গতিতে আগাচ্ছে রেল লাইন পার হয়ে। করিম উদ্দিন মনে মনে ভাবে কার পাকা ধানে মই দিয়ে দিলো !
কলিম উদ্দিন অবশ্য কড়া সত্য বলতে গিয়ে এলাকার চেয়ারম্যান রইসুদ্দিন খান এর চক্ষুশূল। আজকের ঘটনায় কি খান সাহেবের মেজাজ চড়ে গেলো ? ভরা মজলিশে সত্য বলে রইসুদ্দিন খানের তেলতেলে মুখটাকে একেবারে খরখরে করে দিয়েছে কলিম উদ্দিন। সদা সত্যবাদি কলিম উদ্দিনের বুকটার হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠে, নিজের জন্য না , বাসায় পরে থাকা অসুস্থ ভাইটার জন্য। বৌটার জন্য আর , বৃদ্ধ বাবা মার জন্য।
কলিম উদ্দিন রাস্তা পার হতে হতে ভাবে , মনটা খালি কেউ ডাকছে কেন। ! ভাবতে ভাবতেই সামনে গ্রামের বাজারে এসে পড়লো কলিম উদ্দিন। তার বার বার মনে হচ্ছিলো হাজারো অদৃশ্য চোখের শানিত দৃষ্টি তার পেটে পিঠে বিঁধছে।
দূর থেকে মনে হলো কিছু লোক ঘোট পাকাচ্ছে। দেখতে দেখতে সাদা পোশাকের কিছু মানুষ এগিয়ে এলো। কে জানি বলে উঠলো অমুক মজলিশের সন্ত্রাস কাণ্ডে এই লোক দায়ী। আগ্রহী জনতার মুখের সন্দেহ ধীরে ধীরে বিশ্বাস থেকে প্রত্যয়ে রূপ নিলো।
পিছু হঠছে কলিম উদ্দিন। সামনে আগাচ্ছে মানুষ গুলো। সামনে তারা পেয়েগেছে স্বীকার। তাদের বছরের পরিচিত কলিম উদ্দিন তাদের চোখে খুনি, সন্ত্রাস। নেতৃত্ত্বে রইসুদ্দিনের ভাড়াটে উৎসাহদাতা।
কলিম উদ্দিন জানে সত্য, মিথ্যার আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে। তার এত কালের প্রিয় ভাইয়েরা তার রক্তের নেশায় মত্ত। দূর থেকে, কাছ থেকে , ধার থেকে রইসুদ্দিনের উৎসাহ দেওয়া, প্রমান দেওয়া, নিরেট প্রমান দেখানো লোকের অভাব নেই। কোথ্যেকে যেন প্রত্যক্ষদর্শী , ভুক্তভুগিও চলে এলো আচানক।
কলিম উদ্দিন প্রাণ ভয়ে ছুটছে। পিছিনে উৎসাহী জনতা। খুনির রক্তে হাত রাঙাবে বলে বিভোর ,_ ছুটে আসছে। কলিম উদ্দিন দুচোখ মেললেই এক সবুজ দুনিয়া দেখছে , খালি মনে হচ্ছে হারিয়ে যাচ্ছে সে দুনিয়া থেকে। ছুটতে ছুটতেই পৃথিবীর জন্য বিষাদে , ভালো লাগায় , আক্ষেপে তার মন ভোরে গেলো। পিছনে মিথ্যা বিশ্বাসে জাগ্রত জনস্রোত, সামনে কলিম উদ্দিন সত্যকে বুকে নিয়ে মৃত্যুর পথে।
সামনেই পৃথিবী যেন ভাগ হয়ে গেল। . নিচে খরস্রোতা নদী। পিছনে এত উন্মাদ মানুষের হাতে মরার চাইতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে হলেও জীবনের স্বাদ নিতে চাইলো কলিম উদ্দিন। এই পতন যেন দীর্ঘ। মহাকাল এর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে কলিমুদ্দিন ঢাল থেকে গড়িয়ে পড়লো নদীর কিনারেই। এর মধ্যেই কলিম উদ্দিনের মনে শুধু আরেকবার পৃথিবী দেখার স্বাধ। মন ভরে কয়েকটা দিন পরিবারের সাথে কাটাবার স্বাদ। পৃথিবীর বাতাসের জন্মানো কলিম উদ্দিনের এত আক্ষেপ আগে হয়নি।
তার মনে আরেকটা দিন বাঁচার স্বাদ। জানে, পিছনের জনস্রোতে নিমিষেই পিষ্ট হবে , মাংশ খুবলে নিবে বা চক্ষু তুলে নিবে , সত্য হোক বা মিথ্যা কলিম উদ্দিন কে মেরেই তারা মহাবিশ্ব থেকে ত্রাসের বিতাড়ন করবে এবং নিজেদের জাত চিনিয়ে দিবে , পরে হয়তবা যদি প্রমান হয় মৃত কলিম উদ্দিন দোষী ছিলোনা, পিছনের এই মানুষ গুলোই আফসোসে আফসোসে আকাশ বাতাস ফাটিয়ে ফেলবে।
খুনি কলিম কারো কারো কলিম ভাই হয়ে যাবে , বলা যায়না বীরের তকমাও কলিমের জুটতে পারে।
এসব ভাবতে ভাবতেই কলিম উদ্দিন শেষ আশা দেখলো। নদীর পারে খাজে মিশে আছে সে। উপর থেকে দেখায় যাচ্ছেনা। ঘাসে নাক ডুবিয়ে উপরে তাকিয়ে আছে সে। কিছু মানুষের মাথার চাদি দেখা যাচ্ছে শুধু। কলিম উদ্দিন এক মনে আল্লাহকে ডেকে চলে , আল্লারে এই বার বাচাই দে, আরেকটু আল্লাহ আল্লাহ করি , আরেকটু এই মহব্বতের দুনিয়াটা দেখি। উপরে লোক গুলো বুঝি এত নিচে প্যাক কাদায় না নেমেই ঝুকে বুকে দেখেই সিদ্ধান্ত নীল কলিমুদ্দিন নদীর বুকে হারিয়ে গেছে। তারা সেটা বলাবলিও করতে লাগলো। কলিমুদ্দুনের বুকে শুধু আরেকটু আরেকটু আরেকটু করে বাঁচার সাধ। …
উপর থেকে আওয়াজ এলো হঠাৎ , রইসুদ্দিন দা নিয়ে লোক সমেত হাজির। দেশের দশের শত্রুর আজ নিধন হবেই। … কয়েকজন নিরুৎসাহী, বা ভিতরে ভিতরে কলিমুদ্দিনের কাছের কেউ বলে উঠলো ,
হে তো বানে ভাইস গেছে ,,
রইসুদ্দিনের বিশ্বাস হয়না। সে অনিমেষ তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার মুখে এক কালো হাসিতে ভোরে যায়। কলিমুউদিনের ঘাসের সাথে মিশে থাকা জায়গাটার আশেপাশের লেপ্টানো ঘাস থেকে যেখানে কলিমুদ্দিন লুকিয়ে থাকতে পারে সেখানে ঈষৎ নড়াচড়া এর অভ্যাস পেয়েই হক দিলো “ ঐযে স্থানে , লৈ আয় শালারে “ .
বাকিরা নদীর পাড় ধরে নামতে থাকে। কেউ কেউ ঘুরে ঘেরাও করতে যায়। যেন এক সহস্র খুনি , ধর্ষক এর বিচার তারা আজ করবে।
কলিমুদ্দিন কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়ায়। ভেঙে পড়ে , দৌড়ায় ,. কলিমুদ্দিনের বাবার সাথে কেনা অনেকে আগের কোরবানির পশুর কথা মনে পড়ে ,এভাবেই কি তাদের বাঁচার জন্য প্রাণ ধড়ফড় করে ,, এলোমেলোভাবে চিন্তা আসে কলিমুদ্দিনের .মনের মধ্যে আরেকটা দিন , আরেকটা মুহূর্ত বাঁচার আশায় বুকটা কেমন যেন মুচড়ে মুচড়ে উঠে !
.. জানে পালাবার পথ নেই, সহস্র হাত টুটি চেপে ধরবে , তবুও কলিমুদ্দিন আবার সতৃষ্ণ নয়নে , আকাশের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়।………..
কাউকে বুঝাবার নেই , প্রমান করবার নেই , এভাবেই হারিয়ে যায় কলিমুদ্দিনরা অথবা ক্ষীণ আশায় বুক বেঁধে ঘুরে দাঁড়ায়। ………….. বিচার বড় আদালতে তোলা থাকে।
 
 
 
০৬/০৭/২০২০
 
ফেসবুক কমেন্টস

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

প্রতিক্রিয়া

কেউ পছন্দ করেনি?